র্যাডক্লিফের রোয়েদাদ ঃ
বিভাজনের পর ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা কী হবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব বিলাতের বিখ্যাত ব্যারিস্টার স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের সভাপতিত্বে একটি কমিশনের হাতে অর্পন করা হয়। এই সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব প্রদানের জন্য স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের নামটি প্রস্তাব করেছিলেন লীগ নেতা মহম্মদ আলি জিন্না। র্যাডক্লিফের বিষয়ে প্রথম দিকে কংগ্রেসের আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস নেতারা তাঁকে মেনে নিয়েছিলেন। র্যাডক্লিফ বিখ্যাত ব্যারিস্টার হলেও ভারত সম্পর্কে তাঁর বিশেষ কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। সীমানা নির্ধারণ কমিশনের চেয়ারম্যান হওয়ার আগে র্যাডক্লিফ কখনো ভারতেও আসেননি। অধ্যাপক আনন্দগোপাল ঘোষ লিখেছেন যে, “র্যাডক্লিফ জানতেন না কোথায় বাংলা, আর কোথায় পাঞ্জাব। অথচ এই দুটি অঞ্চল ভাগ করতে হবে ধর্মের ভিত্তিতে! তাই ভারতে আসার পূর্বমুহূর্তে ‘ইণ্ডিয়া অফিস’-এর উপসচিব তাঁকে উপমহাদেশের একটি মানচিত্র দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কী করতে হবে। . . . র্যাডক্লিফ মানচিত্র দেখে প্রথম আবিষ্কার করলেন যে, প্রায় ন-কোটি লোক, তাঁদের বাড়ি, তাঁদের ধানক্ষেত, পাটক্ষেত, সব্জিক্ষেত, গোচারণভূমি, রেলপথ, কারখানাÑ সবই বিভাজন করতে হবে।” র্যাডক্লিফ ৮ই জুলাই ভারতের মাটিতে পা রাখেন এবং মাত্র ৩৫ দিনের মধ্যে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমানা বিভাজনের কাজটি সম্পূর্ণ করেন। ৯ই আগস্টের মধ্যে বাংলা এবং ১২ই আগস্টের মধ্যে পাঞ্জাব বিভাজনের রূপরেখা সম্পূর্ণ করে ফেলেন। ১৩ই আগস্ট র্যাডক্লিফের সুপারিশপত্র ভাইসরয়ের দপ্তরে জমা পড়ে। এই বিভাজনের পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা অনুমান করেই র্যাডক্লিফ ১৪ই আগস্ট ইংল্যাণ্ডে ফিরে যান। তিনি এরপর আর কোনদিন ভারতে আসেননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এদেশে এলে তিনি নিহত হতে পারেন।
সীমানা কমিশনের প্রধান স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ (১৮৯৯ - ১৯৭৭ খ্রি.) মাত্র মাসখানেক সময়ের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের মানচিত্রে ছুরি চালিয়ে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমানা বিভাজিত করেন এবং ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণ করেন। মাত্র ৯টি পৃষ্ঠায় বাংলার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। অতি অল্প সময়ে র্যাডক্লিফ বাংলা ও পাঞ্জাবের যে সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন তাতে বহু ক্ষেত্রেই অবিবেচনার ছাপ ছিল স্পষ্ট। তাছাড়া ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে জাতিগত ভিত্তিতে সীমানা পৃথক করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যতœ নেওয়ার আন্তরিকতাও পুরোপুরি ছিল না। অধ্যাপক আনন্দগোপাল ঘোষ লিখেছেন, “ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল স্যার ক্লড অকিনলেক র্যাডক্লিফকে বলেছিলেন যে, জাতি গঠনের জন্য যেভাবে সীমান্ত তৈরী করতে হয় বা প্রতিরক্ষার কথা বিবেচনা করতে হয়, সে-সব এখানে ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই।” র্যাডক্লিফ লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে জানিয়েছিলেন যে, এত অল্প সময়ে অতি দ্রুততায় বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমানা বিভাজন করতে গেলে তাতে ভয়াবহ ভুল হতে পারে এবং এর ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। কিন্তু মাউন্টব্যাটেন তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, “পরিণতি যতই ভয়াবহ হোক না কেন, ভারতবর্ষকে এই বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হিসেবেই মেনে নিতে হবে।” তাই দেশবিভাগের ফলে ভারত ও পাকিস্তানে যে শরণার্থী বা উদ্বাস্তু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল তা র্যাডক্লিফের এই অবিবেচনাপ্রসূত সীমানা নির্ধারণের ফলে তীব্রতর হয়। এই সমস্যার গভীরতা, ভয়াবহতা, অমানবিকতা, ছিল অতীব তীব্র ও বেদনাদায়ক।
যাই হোক, বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমানা নির্ধারণের জন্য পৃথক দুটি কমিটি গঠিত হয়। র্যাডক্লিফ ছাড়া বাংলার সীমানা কমিশনের অপর চারজন সদস্য ছিলেন চারুচন্দ্র বিশ্বাস, বিজনকুমার মুখোপাধ্যায়, আবু সালেহ মহম্মদ আক্রাম এবং এম এ রহমান। ছাপানো অক্ষরে মাত্র ৯ পাতায় বাংলার সীমানা বিভাজিত হয়ে যায়। র্যাডক্লিফ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই আগস্ট বিকেল ৫টায় সীমানা কমিশনের সুপারিশের কপি তার সদস্যদের বোঝার সুযোগ দেন। এরপর র্যাডক্লিফ দুটি পৃথক খামে করে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমানা নির্ধারণের সুপারিশ বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেনের হাতে তুলে দেন। ১৫ই আগস্টের ¯^াধীনতা দিবসের আনন্দ উৎসব যাতে কালিমালিপ্ত না হয় তার জন্য দু’দিন পরে অর্থাৎ ১৭ই আগস্ট ভারত ও পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের হাতে র্যাডক্লিফের সুপারিশগুলি তুলে দেওয়া হয়। কলকাতাসহ সম্পূর্ণ বর্ধমান ডিভিসন, দার্জিলিং জেলা পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হয়। এছাড়া দেশীয় রাজ্য কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হল সম্পূর্ণ চট্টগ্রাম ডিভিসন ও ঢাকা ডিভিসন, রাজসাহী ডিভিসনের রাজসাহী, রংপুর, বগুড়া, পাবনা প্রভৃতি জেলা এবং প্রেসিডেন্সি ডিভিসনের খুলনা জেলা।
লেখক পরিচিতি
নাম : সুভাষ বিশ্বাস
পরিচিতি : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, বিদ্যাসাগর মেট্রোপলিটন কলেজ, কলকাতা
ইমেল : subhasbiswaschak@gmail.com
Khub bhalo hoyeche
ReplyDeleteKhub bhalo hoyeche
ReplyDeleteTnx for post
ReplyDelete